আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুদ্ধ বিরতির মধ্যেই চীন আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানকে নতুন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে দাবি করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা। সম্প্রতি হাতে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য মূল্যায়নের সঙ্গে জড়িত তিনটি সূত্র আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের কাছে এমন তথ্য জানিয়েছেন। শনিবার (১১ এপ্রিল) সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এটি একটি উস্কানিমূলক পদক্ষেপ হবে, বিশেষ করে যখন বেইজিং বলেছে, তারা চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মধ্যস্থতা করতে সাহায্য করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও আগামী মাসের শুরুতে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনার জন্য চীন সফরে যাচ্ছেন।
ওই সূত্রগুলো বলছে, মার্কিন গোয়েন্দারা দাবি করছেন, ইরান হয়তো এই যুদ্ধবিরতিকে একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। যুদ্ধবিরতির এ সময়ে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি অংশীদারদের সহায়তায় ইরান হয়তো কিছু নির্দিষ্ট অস্ত্রব্যবস্থা আবার মজুত করছে।
দুটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, বেইজিং চালানগুলোর আসল উৎস গোপন করতে তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে সেগুলো পাঠানোর চেষ্টা করছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, বেইজিং যে ব্যবস্থাগুলো হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছে তা হলো কাঁধে বহনযোগ্য বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, যা ‘ম্যানপ্যাড’ নামে পরিচিত। এসব অস্ত্র পাঁচ সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধের সময় অপেক্ষাকৃত নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজের জন্য একটি অসম হুমকি তৈরি করেছিল। চলমান যুদ্ধবিরতি ভেস্তে গেলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের হুমকি তৈরি হতে পারে।
ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, চীন এই সংঘাতের কোনো পক্ষকেই কখনো অস্ত্র সরবরাহ করেনি; উল্লিখিত তথ্যটি সত্য নয় বলেও দাবি করেন তিনি।
দূতাবাসের মুখপাত্র বলেন, ‘একটি দায়িত্বশীল বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে চীন ধারাবাহিকভাবে তার আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা পালন করে আসছে। আমরা মার্কিন পক্ষকে ভিত্তিহীন অভিযোগ করা, বিদ্বেষবশত যোগসূত্র স্থাপন করা এবং চাঞ্চল্যকর কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই; আমরা আশা করি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো উত্তেজনা প্রশমনে আরও বেশি সহায়তা করবে।’
চলতি সপ্তাহের শুরুতে দূতাবাসের একজন মুখপাত্র সিএনএনকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বেইজিং যুদ্ধবিরতি ও সংঘাতের অবসান ঘটাতে সহায়তা করার জন্য কাজ করে আসছে।
গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যুদ্ধের মধ্যে ইরানের আকাশে একটি মার্কিন এফ–১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। একটি কাঁধে বহনযোগ্য তাপ অনুসন্ধানী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত করে ওই যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, তারা বিমানটিকে আঘাত হানতে একটি ‘নতুন’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করেছিল। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। ওই ব্যবস্থাটি চীনে তৈরি কি-না, তা স্পষ্ট নয়।
মার্কিন সূত্র দাবি করছে, চীন যদি এখন ইরানে ম্যানপ্যাডস বা ম্যান পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম পাঠায়, তবে তা স্বাভাবিকভাবেই ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে উসকানিমূলক পদক্ষেপ হবে।
সূত্র জানায়, চীনের কোম্পানিগুলো ইরানকে নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি বিক্রি অব্যাহত রেখেছে। এসব প্রযুক্তি ইরানকে অস্ত্র তৈরি অব্যাহত রাখতে ও নিজেদের নজরদারির ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে সক্ষম করে তুলেছে। চীন সরকারের সরাসরি অস্ত্রব্যবস্থা সরবরাহ সহায়তার একটি নতুন স্তর হিসেবে বিবেচিত হবে।
আগামী মাসে বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে এবং হোয়াইট হাউস গত বুধবার জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি আলোচনা চলার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানকে রক্ষা করতে প্রকাশ্যে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার কোনো বাস্তব কৌশলগত মূল্য চীনের কাছে নেই। তারা জানে, এ যুদ্ধ জেতা সম্ভব নয়। এর পরিবর্তে, বেইজিং নিজেকে ইরানের অবিচল বন্ধু হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে—যার তেলের ওপর দেশটি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল—এবং বাহ্যিকভাবে নিরপেক্ষ থাকছে, যাতে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তারা নিজেদের দায় অস্বীকার করতে পারে।
সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, চীন এই যুক্তিও দিতে পারে যে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো আক্রমণাত্মক নয়, বরং প্রতিরক্ষামূলক, যা রাশিয়ার সমর্থন থেকে তাদের সমর্থনকে আলাদা করে।
সিএনএন জানিয়েছে, মস্কো যুদ্ধচলাকালীন গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে আসছে, যা ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা ও সম্পদকে সক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু করতে সাহায্য করেছে।
চীন ও রাশিয়া উভয়ের সঙ্গেই ইরানের দীর্ঘদিনের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ইরান ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শাহিদ ড্রোন সরবরাহের মাধ্যমে রাশিয়াকে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছে এবং চীনের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার সিংহভাগ তেলও বিক্রি করেছে।

মতামত জানান